ই’তিকাফের গুরুত: ফাযায়েল ও মাসায়েল-মাহবুবুল হক সালমান
ই’তিকাফ আরবী শব্দ। আভিধানিক অর্থে ইতিকাফ
হল অবস্থান করা, কোন স্থানে নিজেকে আবদ্ধ রাখা। শরীয়তের পরিভাষায় ইতকিাফ হল
ইবাদত ও সওয়াবের উদ্দেশ্যে, পুরুষর জন্য মসজিদে এবং মহিলাদের জন্য আপন ঘরে
নামাযের জায়গায় অবস্থান করা। রমযানের বিশ তারিখের সূর্যাস্ত থেকে ঈদের
চাঁদ ওঠা পর্যন্ত ইতিকাফ করাকে ইতিকাফে মাসনূন বলা হয়।
ইতিকাফের গুরুত্ব
এাহে রমযানে ই’তিকাফ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। রমযানের ফযিলত, বরকত বিশেষ লাইলাতুল কদওের ফযিলত ও বরকত পাওয়ার জন্য ই’তিকাফের ভূমিক অপরিসীম।
ই’তিকাফের প্রচলন ইসলামের বহু পূর্ব থেকেই রয়েছে। নামায ও অন্যান্য ইবাদতের পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালা হযরত ইবরাহীম ও হযরত ইসমাঈল আ.কে ই’তেকাফ
কারীদের জন্য বাতুল্লাহকে পবিত্র করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি ইবরাহীম ও ইসামাঈলকে আদেশ করলাম তোমরা আমার ঘরকে তওয়াফকারী, ই’তিকাফকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ। -সূরা বাকারা ১২৫
রাসূল সা. প্রত্যেক রমযানে দশ দিন ইতিকাফ করতেন। তবে ওফাতের বছর বিশ দিন ইতিকাফ করেছেন। -সহীহ বুখারী ২০৪৪
ই’তিকাফের ফযিলত:
যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এক দিন ইতিকাফ করবে আল্লাহ তায়ালা তার এবং জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। অর্থাৎ আসমান ও জমিনের মাঝে যত দূরত্ব আছে তার চেয়েও বেশি দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। -শুআবুল ঈমান ৩৯৬৫
রাসূল সা. তাঁর মাদানী জীবনে মাত্র একটি রমযানে জিহাদের সফরের কারণে ইতিকাফ করতে পারেননি। পরবর্তী বছর ২০ দিন ই’তিকাফ করে তা পূরণ করে নিয়েছেন। এ ঘটনা ছাড়া তিনি একটি ই’তিকাফও ছাড়েননি। সাহাবীগণও তাঁর সাথে ইতিকাফে শরীক হতেন। তাই ই’তিকাফ একটি মর্যাদাপূর্ণ মাসনূন আমল। কোন মসজিদ ই’তিকাফশূন্য থাকলে পুরো এলাকাবাসী সুন্নতে মুআক্কাদা বর্জনের গুনাহগার হবে। হাদীস শরীফে এসেছে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম রমজানে শেষ দি ই’তিকাফ করতেন। কিন্তু এক বছর ই’তিকাফ করতে পারেননি। পরবর্তী বছর বিশরাত [দিন] ই’তিকাফ করেছেন।“সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪৩৬, ফাতহুল বারী৪/৩৩৪]
ইতিকাফের উপকারিতা:
১. শবে কদর অন্বেষণের অন্যতম মাধ্যম হল ইতিকাফ। নবী কারীম সা. রমযানের মাঝের দশ দিন ইতিকাফ করতেন। এক বছর এভাবে ইতকাফ শেষ করার পর যখন রমযানের ২১তম রাত আসল (অর্থাৎ যে রাত গিয়ে সকালে তিনি ইতিকাফ থেকে বের হবেন) তিনি ঘোষণা করলেন, যে ব্যক্তি আমার সাথে ইতিকাফ করেছে সে যেন শেষ দশকে ইতিকাফ করে। কারণ আমাকে শবে কদর সম্পর্কে অবগত করা হয়েছিল (যে তা শেষ দশকের ওমুক রাত) এরপর তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরা শবে কদর শেষ দশকে খোঁজ কর। -সহীহ বুখারী ২০২৭
২. ইতিকাফকারী অবসর সময়ে কোন আমল না করলেও তার দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ইবাদত হিসাবেই গণ্য হয়।
৩. ইতিকাফের বদৌলতে অনেক গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায়। পাপাচারের সয়লাব থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল াহ তায়ালার ঘর যেন একটি প্রকৃত দূর্গ।
৪. ইতিকাফ দ্বারা দুনিয়ার বহু ঝামেলা থেকে মুক্ত করে নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহ তায়ালার কাছে সঁপে দেওয়া হয়। রোযার কারণে পুরো দিন ফেরেশতাদের সাথে (পানাহার ও যৌন কর্ম বর্জন দ্বারা) সামঞ্জস্য হয়। আর ইতিকাফের দ্বারা ২৪ ঘণ্টা ফেরেশতাসূলভ আচরণের উপর অবিচল থাকার চমৎকার প্রশিক্ষণ হাসিল হয়।
৫. রোযার যাবতীয় আদব ও হক যথাযথ আদায় করে পরিপূর্ণ রোযা আদায় করার জন্য ইতিকাফ যথেষ্ট কর্যকর।
৬. আল্লাহ তায়ালার মেহমান হয়ে তাঁর সাথে মহব্বত ও ভালবাসা সৃষ্টি করার অন্যতম মাধ্যম। সশ্রদ্ধ একান্ত সংলাপের জন্য ইতিকাফের বিকল্প বিরল। মসজিদে অবস্থান করার কারণে ইতিকাফকারী যে সকল আমল করতে অক্ষম যেমন জানাযায় শরীক হওয়া, অসুস্থদের সেবা করা ইত্যাদি- এ সব আমল না করেও তার সওয়াব পেতে থাকা।
ইতিকাফের মাসায়েল:
* মাসনূন ইতিকাফ যেহেতু শেষ দশ দিন ব্যাপী, তাই প্রথম থেকেই পুরো দশ দিন ইতাকাফ করার নিয়ত করবে। এক সাথে দশ দিনের নিয়ত না করলে সুন্নত ইতিকাফ আদায় হবে না; বরং তা নফলে পরিণত হবে।
* ২০ তারিখ সূর্যাস্তের আগেই ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে পৌঁছে যাওয়া জরুরী।
* মাসনূন ইতিকাফ শুরু করলে তা পূর্ণ করা আবশ্যক। ওযর ব্যতীত তা ভাঙ্গা জায়েয নেই।
* ইতিকাফকারীর জন্য ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রীসহবাস করা হারাম। তেমনি স্ত্রীকে চুমু খাওয়া, আলিঙ্গন করা ইত্যাদি সব কিছুই নাজায়েয।
* মাসনূন ইতিকাফ শুরু করার পর মাঝে দুএক দিন যদি ভঙ্গ হয়ে যায় তাহলে সে দিনগুলোর ইতিকাফ পরে কাযা করে নিতে হবে। অর্থাৎ যে কয়দিনের ইতিকাফ ভঙ্গ হয়েছে সে কয়দিনের জন্য রোযা অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করবে।
* পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ইতিকাফ করা ও করানো উভয়ই নাজায়েয।
* ইতিকাফের দিনগুলোতে তেলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল ও ইবাদত-বন্দিগীতে কাটানো উত্তম।
* কিছু সময় দীনী মাসায়েলের কিতাবাদী পড়াশোনা করা এবং অন্যকে শোনানো উচিত।
* পুরুষরা শুধু মসজিদে ই’তিকাফ করবে। আর মহিলারা তাদের ঘরে নামাযের জায়গায় ইতিকাফ করবে।
* মহিলারা তাদের ই’তিকাফের স্থানকে পর্দা দিয়ে ঢেকে দিবে, যেন কোন বেগানা পুরুষ আসলে স্থান পরিবর্তন করতে না হয়।
* অজ্ঞান বা পাগল হয়ে গেলে ই’তিকাফ নষ্ট হয় না। তবে তা যদি পরবর্তী দিন বা আরো বেশি সময় পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয় তাহলে প্রথম দিন বাদ দিয়ে যে কয়দিন এ অবস্থায় কাটে সেগুলোর কাযা কারে নিতে হবে।
* ই’তিকাফ সহীহ হওয়ার জন্য শরয়ী মসজিদ হওয়া জরুরী। জামে সমজিদ হোক বা পাঞ্জেগানা উভয়টিতেই ই’তিকাফ করা যায়।
ই’তিকাফ অবস্থায় যা করা যায়:
* অন্যান্য রোযাদারদের মত রাতের বেলায় খাওয়া-দাওয়া বা চা পান করা ইত্যাদি সবকিছুই ই’তিকাফকারীর জন্য জায়েয।
* প্রয়োজনীয় দুনিয়াবী কথাবর্তা বলা জায়েয।
* প্রয়োজন মত আরাম করা ও ঘুমানো জায়েয।
* জরুরী চিঠিপত্র লেখা এবং ধর্মীয় বইপত্র লেখা জায়েয।
* মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় শুধু প্রয়োজনীয় বেচাকেনার কথাবর্তা বলা জায়েয। তবে পন্য মসজিদের ভেতর প্রবেশ করানো যাবে না।
* ডাক্তাররা প্রয়োজনবশত ইতিকাফ অবস্থায় বিনা পারিশ্রমিকে চিকিৎসাপত্র লিখতে পারবে।
* মল-মুত্র ত্যাগ, অজু, (ফরয ও নফল) ফরয গোসল ও সুন্নত গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েয।
* খাবার মসজিদের পৌঁছে দেওয়ার কেউ না থাকলে নিজে গিয়ে তা আনতে পারবে।
* মুয়াজ্জিন ই’তিকাফ করলে এবং আজানের জায়গা মসজিদের বাইরে হলে বাইরে গিয়ে তার জন্য আযান দেওয়া জায়েয।
* পাঞ্জেগানা মসজিদ হলে জুমার নামাযের জন্য জামে মসজিদে যাওয়া জায়েয।
* জুমার শেষে (৪ রাকাত ও ২ রাকাত মোট ৬ রাকাত সুন্নত পড়ে সাথে সাথে) ইতিকাফের স্থানে ফিরে আসবে।
* অজু-ইস্তিঞ্জার জন্য বের হলে যদি কোন জানাযা উপস্থিত থাকে তাহলে পথে বিলম্ব না করে জানাযার নামায পড়ে নেওয়া জায়েয।
* ফরয ও মাসনূন গোসল (যেমন জুমার গোসল) ছাড়া স্বাভাবিক গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হবে না। তবে খুব বেশি প্রয়োজন দেখা দিলে মসজিদের ভেতরে বসে মাথা বের করে দিয়ে মাথায় পানি দিবে। এতেও সমস্যা না কাটলে কোন কোন মুফতীর মতে অজু-ইস্তিঞ্জার জন্য যখন বের হবে তখন নিকটে পানির ব্যবস্থা থাকলে অতিদ্রুত গোসল করে নিবে।
* কুরআন মাজীদ ও দীনী কিতাবের তালীম দেওয়া জায়েয।
* ইতিকাফ অবস্থায় শরীরে তেল লাগানো, খুশবু ব্যবহার করা এবং চুল-দাড়ী আঁচড়ানোর অনুমতি আছে।
* ইতিকাফ অবস্থায় চুপ থাকাকে সওয়াব মনে করে চুপ থাকা অর্থাৎ কোন যিকিরও না করা মাকরূহ তাহরীমী।
* মসজিদ একতলা বিশিষ্ট হোক বা বহুতল বিশিষ্ট, ছাদ মসজিদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুতরাং ইতিকাফকারী ছাদে যেতে পারবে।
মসজিদের বারান্দা যদি মসজিদের অন্তর্ভুক্ত হয় (অর্থাৎ নির্মাণের সময় বারান্দাকেও যদি মসজিদের অংশ মনে করা হয়ে থাকে) তাহলে সেখানেও ইতিকাফকারী যেতে পারবে।
* ইতিাকাফকারী নফল অজুর জন্য মসজিদের বাইরে যেতে পারবে।
মহিলাদরে ইতিকাফ:
* মহিলারা তাদের ঘরে নামাযের স্থানে ইতিকাফ করবে। নামাযের জন্য পূর্ব থেকে কোন স্থান না থাকলে তা নির্দিষ্ট করে নিবে। এরপর সেখানে ইতিকাফ করবে।
* যে মহিলার স্বামী বৃদ্ধ, অসুস্থ বা তার ছোট ছেলে-মেয়ে রয়েছে এবং তাদের সেবা করার কেউ নেই, সে মহিলার জন্য ই’তিকাফের চেয়ে তাদের খেদমত ও সেবা-যতœ করা উত্তম।
* মাসিক (ঋতু¯্রাব) অবস্থায় ই’তিকাফ করা সহীহ নয়। কারণ এ অবস্থায় রোযাই রাখা যায় না। আর মাসনূন ই’তিকাফের জন্য রোযা রাখা জরুরি।
* মহিলাদের উচিত তাদের নির্দিষ্ট দিনগুলোর শুরু-শেষের দিকে লক্ষ্য রেখে ই’তিকাফ করা।
* মহিলারা তাদের ই’তিকাফের নির্দিষ্ট স্থান থেকে ঘরের অন্যত্র যাবে না। অন্যত্র গেলে ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
* মহিলাদের ই’তিকাফ করতে হলে স্বামীর অনুমতি নিয়েই ই’তিকাফ করতে হবে। স্বামীর নিষেধ সত্ত্বেও ই’তিকাফ করলে ই’তিকাফ সহীহ হবে না।
যা করলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যায়:
* ইতিকাফ অবস্থায় সহবাস করলে ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে। এ ছাড়া স্ত্রীকে চুমু খাওয়া বা স্পর্শ করার দ্বারা বীর্যপাত ঘটলে ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
* ফরয ও মাসনূন নয় এমন গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হলে ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
* শিক্ষক ও চাকুরিজীবীরা নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য মসজিদের বাইরে গেলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে। এ ধরণের দায়িত্বশীলদের জন্য ই’তিকাফের আগেই ছুটি নিয়ে নিতে হবে।
* অন্য মসজিদে খতম তারাবীর জন্য গেলেও ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
* বিনা প্রয়োজনে মসজিদের বাইরে গেলে যদিও তা অল্প সময়ের জন্য হয়, ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
* কোন কারণে রোযা ভেঙ্গে গেলে বা রোযা রাখতে না পারলে ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে। কারণ মাসনূন ও ওয়াজিব ই’তিকাফের জন্য রোযা জরুরি।
* জানাযার জন্য মসজিদ থেকে বের হলে ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
কখন ই’তিকাফ ভাঙ্গা জায়েয:
নি¤œ লিখিত কারণসমূহে ই’তিকাফ ভাঙ্গা জায়েয:
* ই’তিকাফকারীর এমন রোগ হয়েছে, যার চিকিৎসা মসজিদ হতে বের হওয়া ছাড়া সম্ভব নয়। এ অবস্থায় ই’তিকাফ ভাঙ্গা জায়েয আছে।
* ডুবন্ত ব্যক্তি বা অগ্নিদগ্ধকে বাঁচানোর জন্য বা আগুন নেভানোর জন্য ই’তিকাফ থেকে বের হওয়া বৈধ।
* মাতা-পিতা, স্ত্রী বা ছেলে মেয়েদের মধ্যে কেউ বেশী অসুস্থ হলে এবং সেবা করার মতো কেউ না থাকলে ই’তিকাফ থেকে বের হওয়া জায়েয আছে।
উপরোক্ত কারণসমূহে বাইওে গেলে ইতেকাফ ভাঙ্গার গোনাহ তো হবে না, তবে ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
আল বাহরুর রায়েক ২-/৩২৬
ই’তিকাফের আদবসমূহ
ই’তিকাফের উদ্দেশ্য হচ্ছে সকল প্রকার কাজকর্ম ও ধ্যান-ধারণা থেকে পৃথক হয়ে শুধু আল্লাহ তায়ালার ধ্যানে মগ্ন হয়ে যাওয়া। তাই ই’তিকাফে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বা অনর্থক কাজকর্ম থেকে বিরত থাকতে হবে। যথাসম্ভব নফল নামায, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদি ইবাদতের মধ্যে লেগে থাকা উত্তম। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফীক দান করুন। আমীন
লেখক: শিক্ষক, জামিয়া দারুল কুরআন সিলেট
মোবাইল: ০১৭১৫-২৭৪৩৫৭
¡
ইতিকাফের গুরুত্ব
এাহে রমযানে ই’তিকাফ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। রমযানের ফযিলত, বরকত বিশেষ লাইলাতুল কদওের ফযিলত ও বরকত পাওয়ার জন্য ই’তিকাফের ভূমিক অপরিসীম।
ই’তিকাফের প্রচলন ইসলামের বহু পূর্ব থেকেই রয়েছে। নামায ও অন্যান্য ইবাদতের পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালা হযরত ইবরাহীম ও হযরত ইসমাঈল আ.কে ই’তেকাফ
কারীদের জন্য বাতুল্লাহকে পবিত্র করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি ইবরাহীম ও ইসামাঈলকে আদেশ করলাম তোমরা আমার ঘরকে তওয়াফকারী, ই’তিকাফকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ। -সূরা বাকারা ১২৫
রাসূল সা. প্রত্যেক রমযানে দশ দিন ইতিকাফ করতেন। তবে ওফাতের বছর বিশ দিন ইতিকাফ করেছেন। -সহীহ বুখারী ২০৪৪
ই’তিকাফের ফযিলত:
যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এক দিন ইতিকাফ করবে আল্লাহ তায়ালা তার এবং জাহান্নামের মাঝে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। অর্থাৎ আসমান ও জমিনের মাঝে যত দূরত্ব আছে তার চেয়েও বেশি দূরত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। -শুআবুল ঈমান ৩৯৬৫
রাসূল সা. তাঁর মাদানী জীবনে মাত্র একটি রমযানে জিহাদের সফরের কারণে ইতিকাফ করতে পারেননি। পরবর্তী বছর ২০ দিন ই’তিকাফ করে তা পূরণ করে নিয়েছেন। এ ঘটনা ছাড়া তিনি একটি ই’তিকাফও ছাড়েননি। সাহাবীগণও তাঁর সাথে ইতিকাফে শরীক হতেন। তাই ই’তিকাফ একটি মর্যাদাপূর্ণ মাসনূন আমল। কোন মসজিদ ই’তিকাফশূন্য থাকলে পুরো এলাকাবাসী সুন্নতে মুআক্কাদা বর্জনের গুনাহগার হবে। হাদীস শরীফে এসেছে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম রমজানে শেষ দি ই’তিকাফ করতেন। কিন্তু এক বছর ই’তিকাফ করতে পারেননি। পরবর্তী বছর বিশরাত [দিন] ই’তিকাফ করেছেন।“সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৪৩৬, ফাতহুল বারী৪/৩৩৪]
ইতিকাফের উপকারিতা:
১. শবে কদর অন্বেষণের অন্যতম মাধ্যম হল ইতিকাফ। নবী কারীম সা. রমযানের মাঝের দশ দিন ইতিকাফ করতেন। এক বছর এভাবে ইতকাফ শেষ করার পর যখন রমযানের ২১তম রাত আসল (অর্থাৎ যে রাত গিয়ে সকালে তিনি ইতিকাফ থেকে বের হবেন) তিনি ঘোষণা করলেন, যে ব্যক্তি আমার সাথে ইতিকাফ করেছে সে যেন শেষ দশকে ইতিকাফ করে। কারণ আমাকে শবে কদর সম্পর্কে অবগত করা হয়েছিল (যে তা শেষ দশকের ওমুক রাত) এরপর তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং তোমরা শবে কদর শেষ দশকে খোঁজ কর। -সহীহ বুখারী ২০২৭
২. ইতিকাফকারী অবসর সময়ে কোন আমল না করলেও তার দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ইবাদত হিসাবেই গণ্য হয়।
৩. ইতিকাফের বদৌলতে অনেক গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায়। পাপাচারের সয়লাব থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল াহ তায়ালার ঘর যেন একটি প্রকৃত দূর্গ।
৪. ইতিকাফ দ্বারা দুনিয়ার বহু ঝামেলা থেকে মুক্ত করে নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহ তায়ালার কাছে সঁপে দেওয়া হয়। রোযার কারণে পুরো দিন ফেরেশতাদের সাথে (পানাহার ও যৌন কর্ম বর্জন দ্বারা) সামঞ্জস্য হয়। আর ইতিকাফের দ্বারা ২৪ ঘণ্টা ফেরেশতাসূলভ আচরণের উপর অবিচল থাকার চমৎকার প্রশিক্ষণ হাসিল হয়।
৫. রোযার যাবতীয় আদব ও হক যথাযথ আদায় করে পরিপূর্ণ রোযা আদায় করার জন্য ইতিকাফ যথেষ্ট কর্যকর।
৬. আল্লাহ তায়ালার মেহমান হয়ে তাঁর সাথে মহব্বত ও ভালবাসা সৃষ্টি করার অন্যতম মাধ্যম। সশ্রদ্ধ একান্ত সংলাপের জন্য ইতিকাফের বিকল্প বিরল। মসজিদে অবস্থান করার কারণে ইতিকাফকারী যে সকল আমল করতে অক্ষম যেমন জানাযায় শরীক হওয়া, অসুস্থদের সেবা করা ইত্যাদি- এ সব আমল না করেও তার সওয়াব পেতে থাকা।
ইতিকাফের মাসায়েল:
* মাসনূন ইতিকাফ যেহেতু শেষ দশ দিন ব্যাপী, তাই প্রথম থেকেই পুরো দশ দিন ইতাকাফ করার নিয়ত করবে। এক সাথে দশ দিনের নিয়ত না করলে সুন্নত ইতিকাফ আদায় হবে না; বরং তা নফলে পরিণত হবে।
* ২০ তারিখ সূর্যাস্তের আগেই ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে পৌঁছে যাওয়া জরুরী।
* মাসনূন ইতিকাফ শুরু করলে তা পূর্ণ করা আবশ্যক। ওযর ব্যতীত তা ভাঙ্গা জায়েয নেই।
* ইতিকাফকারীর জন্য ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রীসহবাস করা হারাম। তেমনি স্ত্রীকে চুমু খাওয়া, আলিঙ্গন করা ইত্যাদি সব কিছুই নাজায়েয।
* মাসনূন ইতিকাফ শুরু করার পর মাঝে দুএক দিন যদি ভঙ্গ হয়ে যায় তাহলে সে দিনগুলোর ইতিকাফ পরে কাযা করে নিতে হবে। অর্থাৎ যে কয়দিনের ইতিকাফ ভঙ্গ হয়েছে সে কয়দিনের জন্য রোযা অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করবে।
* পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ইতিকাফ করা ও করানো উভয়ই নাজায়েয।
* ইতিকাফের দিনগুলোতে তেলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল ও ইবাদত-বন্দিগীতে কাটানো উত্তম।
* কিছু সময় দীনী মাসায়েলের কিতাবাদী পড়াশোনা করা এবং অন্যকে শোনানো উচিত।
* পুরুষরা শুধু মসজিদে ই’তিকাফ করবে। আর মহিলারা তাদের ঘরে নামাযের জায়গায় ইতিকাফ করবে।
* মহিলারা তাদের ই’তিকাফের স্থানকে পর্দা দিয়ে ঢেকে দিবে, যেন কোন বেগানা পুরুষ আসলে স্থান পরিবর্তন করতে না হয়।
* অজ্ঞান বা পাগল হয়ে গেলে ই’তিকাফ নষ্ট হয় না। তবে তা যদি পরবর্তী দিন বা আরো বেশি সময় পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয় তাহলে প্রথম দিন বাদ দিয়ে যে কয়দিন এ অবস্থায় কাটে সেগুলোর কাযা কারে নিতে হবে।
* ই’তিকাফ সহীহ হওয়ার জন্য শরয়ী মসজিদ হওয়া জরুরী। জামে সমজিদ হোক বা পাঞ্জেগানা উভয়টিতেই ই’তিকাফ করা যায়।
ই’তিকাফ অবস্থায় যা করা যায়:
* অন্যান্য রোযাদারদের মত রাতের বেলায় খাওয়া-দাওয়া বা চা পান করা ইত্যাদি সবকিছুই ই’তিকাফকারীর জন্য জায়েয।
* প্রয়োজনীয় দুনিয়াবী কথাবর্তা বলা জায়েয।
* প্রয়োজন মত আরাম করা ও ঘুমানো জায়েয।
* জরুরী চিঠিপত্র লেখা এবং ধর্মীয় বইপত্র লেখা জায়েয।
* মসজিদে ইতিকাফ অবস্থায় শুধু প্রয়োজনীয় বেচাকেনার কথাবর্তা বলা জায়েয। তবে পন্য মসজিদের ভেতর প্রবেশ করানো যাবে না।
* ডাক্তাররা প্রয়োজনবশত ইতিকাফ অবস্থায় বিনা পারিশ্রমিকে চিকিৎসাপত্র লিখতে পারবে।
* মল-মুত্র ত্যাগ, অজু, (ফরয ও নফল) ফরয গোসল ও সুন্নত গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েয।
* খাবার মসজিদের পৌঁছে দেওয়ার কেউ না থাকলে নিজে গিয়ে তা আনতে পারবে।
* মুয়াজ্জিন ই’তিকাফ করলে এবং আজানের জায়গা মসজিদের বাইরে হলে বাইরে গিয়ে তার জন্য আযান দেওয়া জায়েয।
* পাঞ্জেগানা মসজিদ হলে জুমার নামাযের জন্য জামে মসজিদে যাওয়া জায়েয।
* জুমার শেষে (৪ রাকাত ও ২ রাকাত মোট ৬ রাকাত সুন্নত পড়ে সাথে সাথে) ইতিকাফের স্থানে ফিরে আসবে।
* অজু-ইস্তিঞ্জার জন্য বের হলে যদি কোন জানাযা উপস্থিত থাকে তাহলে পথে বিলম্ব না করে জানাযার নামায পড়ে নেওয়া জায়েয।
* ফরয ও মাসনূন গোসল (যেমন জুমার গোসল) ছাড়া স্বাভাবিক গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হবে না। তবে খুব বেশি প্রয়োজন দেখা দিলে মসজিদের ভেতরে বসে মাথা বের করে দিয়ে মাথায় পানি দিবে। এতেও সমস্যা না কাটলে কোন কোন মুফতীর মতে অজু-ইস্তিঞ্জার জন্য যখন বের হবে তখন নিকটে পানির ব্যবস্থা থাকলে অতিদ্রুত গোসল করে নিবে।
* কুরআন মাজীদ ও দীনী কিতাবের তালীম দেওয়া জায়েয।
* ইতিকাফ অবস্থায় শরীরে তেল লাগানো, খুশবু ব্যবহার করা এবং চুল-দাড়ী আঁচড়ানোর অনুমতি আছে।
* ইতিকাফ অবস্থায় চুপ থাকাকে সওয়াব মনে করে চুপ থাকা অর্থাৎ কোন যিকিরও না করা মাকরূহ তাহরীমী।
* মসজিদ একতলা বিশিষ্ট হোক বা বহুতল বিশিষ্ট, ছাদ মসজিদের অন্তর্ভুক্ত হবে। সুতরাং ইতিকাফকারী ছাদে যেতে পারবে।
মসজিদের বারান্দা যদি মসজিদের অন্তর্ভুক্ত হয় (অর্থাৎ নির্মাণের সময় বারান্দাকেও যদি মসজিদের অংশ মনে করা হয়ে থাকে) তাহলে সেখানেও ইতিকাফকারী যেতে পারবে।
* ইতিাকাফকারী নফল অজুর জন্য মসজিদের বাইরে যেতে পারবে।
মহিলাদরে ইতিকাফ:
* মহিলারা তাদের ঘরে নামাযের স্থানে ইতিকাফ করবে। নামাযের জন্য পূর্ব থেকে কোন স্থান না থাকলে তা নির্দিষ্ট করে নিবে। এরপর সেখানে ইতিকাফ করবে।
* যে মহিলার স্বামী বৃদ্ধ, অসুস্থ বা তার ছোট ছেলে-মেয়ে রয়েছে এবং তাদের সেবা করার কেউ নেই, সে মহিলার জন্য ই’তিকাফের চেয়ে তাদের খেদমত ও সেবা-যতœ করা উত্তম।
* মাসিক (ঋতু¯্রাব) অবস্থায় ই’তিকাফ করা সহীহ নয়। কারণ এ অবস্থায় রোযাই রাখা যায় না। আর মাসনূন ই’তিকাফের জন্য রোযা রাখা জরুরি।
* মহিলাদের উচিত তাদের নির্দিষ্ট দিনগুলোর শুরু-শেষের দিকে লক্ষ্য রেখে ই’তিকাফ করা।
* মহিলারা তাদের ই’তিকাফের নির্দিষ্ট স্থান থেকে ঘরের অন্যত্র যাবে না। অন্যত্র গেলে ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
* মহিলাদের ই’তিকাফ করতে হলে স্বামীর অনুমতি নিয়েই ই’তিকাফ করতে হবে। স্বামীর নিষেধ সত্ত্বেও ই’তিকাফ করলে ই’তিকাফ সহীহ হবে না।
যা করলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যায়:
* ইতিকাফ অবস্থায় সহবাস করলে ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে। এ ছাড়া স্ত্রীকে চুমু খাওয়া বা স্পর্শ করার দ্বারা বীর্যপাত ঘটলে ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
* ফরয ও মাসনূন নয় এমন গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হলে ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
* শিক্ষক ও চাকুরিজীবীরা নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য মসজিদের বাইরে গেলে ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে। এ ধরণের দায়িত্বশীলদের জন্য ই’তিকাফের আগেই ছুটি নিয়ে নিতে হবে।
* অন্য মসজিদে খতম তারাবীর জন্য গেলেও ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
* বিনা প্রয়োজনে মসজিদের বাইরে গেলে যদিও তা অল্প সময়ের জন্য হয়, ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
* কোন কারণে রোযা ভেঙ্গে গেলে বা রোযা রাখতে না পারলে ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে। কারণ মাসনূন ও ওয়াজিব ই’তিকাফের জন্য রোযা জরুরি।
* জানাযার জন্য মসজিদ থেকে বের হলে ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
কখন ই’তিকাফ ভাঙ্গা জায়েয:
নি¤œ লিখিত কারণসমূহে ই’তিকাফ ভাঙ্গা জায়েয:
* ই’তিকাফকারীর এমন রোগ হয়েছে, যার চিকিৎসা মসজিদ হতে বের হওয়া ছাড়া সম্ভব নয়। এ অবস্থায় ই’তিকাফ ভাঙ্গা জায়েয আছে।
* ডুবন্ত ব্যক্তি বা অগ্নিদগ্ধকে বাঁচানোর জন্য বা আগুন নেভানোর জন্য ই’তিকাফ থেকে বের হওয়া বৈধ।
* মাতা-পিতা, স্ত্রী বা ছেলে মেয়েদের মধ্যে কেউ বেশী অসুস্থ হলে এবং সেবা করার মতো কেউ না থাকলে ই’তিকাফ থেকে বের হওয়া জায়েয আছে।
উপরোক্ত কারণসমূহে বাইওে গেলে ইতেকাফ ভাঙ্গার গোনাহ তো হবে না, তবে ই’তিকাফ ভেঙ্গে যাবে।
আল বাহরুর রায়েক ২-/৩২৬
ই’তিকাফের আদবসমূহ
ই’তিকাফের উদ্দেশ্য হচ্ছে সকল প্রকার কাজকর্ম ও ধ্যান-ধারণা থেকে পৃথক হয়ে শুধু আল্লাহ তায়ালার ধ্যানে মগ্ন হয়ে যাওয়া। তাই ই’তিকাফে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বা অনর্থক কাজকর্ম থেকে বিরত থাকতে হবে। যথাসম্ভব নফল নামায, কুরআন তিলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদি ইবাদতের মধ্যে লেগে থাকা উত্তম। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফীক দান করুন। আমীন
লেখক: শিক্ষক, জামিয়া দারুল কুরআন সিলেট
মোবাইল: ০১৭১৫-২৭৪৩৫৭
¡



No comments
hi freinds